নির্বাচন হবে, তবে কবে? | সময় বিচিত্রা
নির্বাচন হবে, তবে কবে?
মাহমুদ আল ফয়সাল
35

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ। তাৎক্ষণিকভাবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট ঘোষিত তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে নতুন করে তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, বিরোধী দল নির্বাচনে আসলে পুনরায় তফসিল হবে। এই বাস্তবতায় নির্বাচনী নানা প্রক্রিয়া শুরু হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে সন্দেহ-সংশয়। যদিও সরকারি দল বলছে, যথাসময়ে নির্বাচন হবে। তবে কবে হবে, তা নিয়েই রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা নানা কথাবার্তা বলছেন।

 

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এরই মধ্যে তফসিল ঘোষণার পর ১৮-দলীয় জোটের টানা অবরোধ হরতালে বিপর্যস্ত দেশ; ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি সর্বত্র দেখা দিয়েছে স্থবিরতা; থেমে গেছে প্রগতির চাকা। দেশ জুড়ে চলছে সংঘাত। ঘটছে প্রাণহানির অনেক ঘটনা। উদ্বিগ্ন দেশবাসী। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণ মানুষ সবাই চিন্তিত। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেন মুহাম্মদ এরশাদের আকস্মিক নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষনা এ সংশয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। হাটে-মাঠে-ঘাটে একই আলোচনা-শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে তো?

৪ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদ ঘোষনা দেন যেহেতু সব দল নির্বাচনে যাচ্ছে না তাই তিনিও যাবেন না।  জাতীয় পার্টির যেসব সদস্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে এরশাদ বলেন, আমি নির্দেশ দিয়েছি আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র তুলে নেয়ার জন্য। এতে করে রাজনীতিতে তৈরী হয় নতুন মেরুকরণ।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংঘাত-সংঘর্ষ তথা সহিংসতার আঁচ বিদেশিদের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এরই মধ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, পরিস্থিতি এমন সংঘাতময় থাকলে বাংলাদেশের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না তারা। ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়ে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা বলেছেন, সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তিনিসহ আরও বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদূত স্পষ্টভাবে বলেছেন, তাদের প্রত্যাশা সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও এমনই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন।

 

দেশের সম্ভাবনাময় পোশাক খাত এরই মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এই খাতের শিল্পমালিকরা। আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি দফায় দফায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে তাতেও কোনো বরফ গলছে না। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম পারভেজ বলেছেন, পোশাক খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে সামনে। নতুন বছর মার্চের পর বায়াররা তাদের অর্ডার স্থগিত রাখছে। বিরাজমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী ৫/৬ মাসের মধ্যে শতকরা ৩৫ ভাগ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আনোয়ারুল আলম পারভেজ। সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য সরকার ও বিরোধী দলকে দায়ী করেছেন তিনি। এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদও বিরাজমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন সফল করতে একের পর এক নির্বাচনমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রথমে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন; মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন; মন্ত্রিসভায় মহাজোটের শরিকদের অংশগ্রহণ; মন্ত্রিসভার বাইরে সংসদ সদস্য নন, এমন কয়েকজনকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। ‘সর্বদলীয়’ ব্যানারের মন্ত্রিসভায় বিরোধী দলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ; মন্ত্রণালয় নেওয়ার জন্য আহ্বানসহ নানা প্রচেষ্টা চালিয়েছে। ক্রমেই তারা নির্বাচনী কার্যক্রমে বেশি মাত্রায় নিজেদের সম্পৃক্ত করছে।

 

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। আর সবাই এক আসনে। দলীয় মনোনয়ন পাননি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রাণীসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, সাংসদ ও অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী, ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াসউদ্দিনসহ আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সাংসদ। নানা কারণে বিতর্কিত হওয়ায় তাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি বলেই জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। এদিকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা স্পষ্ট করে বলছেন, নির্ধারিত সময়েই দেশে নির্বাচন হবে। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে তার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, কোনো চেষ্টাই নির্বাচনকে প্রতিহত করতে পারবে না। নির্ধারিত সময়েই দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

 

 

নির্বাচন-কেন্দ্রিক জোর প্রস্তুতি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরব থাকলেও মাঠে তেমন উত্তাপ নেই। বিরোধী দল না এলে নির্বাচন হবে একতরফা; সেই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিএনপি-জামাত ঘরানার বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, কার্যত নির্বাচনে বিরোধী দল না এলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে সরকারি দলের সুবিধাভোগী বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত সারা দেশ; বিএনপি দলগতভাবে নির্বাচনে না এলেও স্বতন্ত্র ব্যানারে অনেকে দাঁড়ানোর কারণে ভোটারের উপস্থিতি থাকবে প্রচুর; সেই হিসাবে নির্বাচনকে সর্বজনীন করার সব চেষ্টা চালাবে মহাজোটের দলগুলো। তবে বিরোধী দলের টানা কর্মসূচির কারণে মাঠের নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে-মধ্য ডিসেম্বরের পরই তা স্পষ্ট হবে।

 

সাংবিধানিকভাবে আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে বর্তমান সংসদের ও সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। তার আগেই নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তফসিল পুনর্নির্ধারণের যে চিন্তাভাবনাÑতার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতের পথে এরই মধ্যে অনেকটা পথ পেরিয়েছে সবাই। নাটকীয় কিছু না হলে নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটকে দেখা যাবে না। সে ক্ষেত্রে শাসকেরা চাইবে নির্বাচন নির্ধারিত তারিখে সম্পন্ন করতে। তবে বিরোধী দলও বসে থাকবে না। মাঠ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এমন পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করতে চায়, যাতে দেশি-বিদেশি চাপে পড়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হবে।

 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের মানুষ একতরফা পাতানো নির্বাচন মেনে নেবে না। আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের ভোটের অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার তারা আদায় করবে। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলকে স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না। এই চরম অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নই উঠতে পারে না। আর বিএনপির নতুন মুখপাত্র ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেই সৃষ্ট সংকটের সমাধান হবে। তবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। কোনো ষড়যন্ত্রই নির্বাচনকে বানচাল করতে পারবে না। জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও স্পষ্ট করে বলেছেন, বিরোধী দল শত চেষ্টা করেও নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না।

 

বিরোধী জোটে না থাকলেও নির্দলীয় সরকারের দাবিতে তাদের অবস্থানকে সমর্থনকারী বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের দাবি, সরকার ও বিরোধী দল কার্যত সমঝোতার কাছাকাছি রয়েছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে বিরোধীদের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারি দলের কোনো সাংসদকে প্রধানমন্ত্রী করা হলেই সমঝোতা হয়ে যায় এক মুহূর্তে। তবেই বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট দূর হবে; আর সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে। তবে সরকারি দলের কেউই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি মানতে নারাজ। ক্রমেই তারা শক্ত অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, বিরোধী দল না এলেও নির্বাচন হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও ভোটকেন্দ্রে ভোটারের ব্যাপক উপস্থিতিই আগামী নির্বাচনকে বৈধতা দেবে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানে অনঢ়।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কবি ও সংগঠক গোলাম কাদেরের মতে, পর্দার আড়ালে বৈঠক ও আলোচনা-আলোচনা খেলার মধ্য দিয়ে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। এখন সরকার ও বিরোধী দল যে যার অবস্থানে থেকে মরণকামড় দেবে। সরকারি দল নির্বাচন অনুষ্ঠানে যেমনি মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাবে; তেমনি নির্বাচনী ট্রেন থামাতে বিরোধী দলও রেললাইনের ফিশপ্লেট তুলে ফেলার মতো কিছু একটা করে বসতে পারে। সরকারি দল হামলা, মামলার কৌশলি পথে এগোনোর কারণে এখনো বিরোধী দলকে ব্যাকফুটে মনে হলেও যেকোনো সময় উল্টে যেতে পারে দৃশ্যপট-এমনটাই ধারণা গোলাম কাদেরের।

 

আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এ কে এম পাটোয়ারী মনে করেন, যতই নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা। নির্বাচন হবে, তবে কবে হবে-তা এখনো পরিষ্কার নয়। তফসিল ঘোষণার পর ক্রমেই সংঘাতময় হয়ে উঠেছে রাজনীতি। ঢাকায় পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে মনে হলেও ঢাকার বাইরে অবরোধ ধীরে ধীরে সহিংস হয়ে উঠেছে। মধ্য ডিসেম্বরের পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী কার্যক্রমে সংঘাত সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ