রাজনীতি এখন সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে | সময় বিচিত্রা
রাজনীতি এখন সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে
মাহমুদ আল ফয়সাল
mahamud-al-faisal

রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা চলছিলসরস আলোচনাযে যার মতো বলছিলেনএকজন আওয়ামী লীগের পক্ষে দুটো লাইন বলতেই আরেকজন বললেন বিএনপির পক্ষেচলছে তর্ক-বিতর্কএর যেন কোনো শেষ নেইচলছে, একজনের পর একজন বলছেকথা উঠল নির্বাচন নিয়েএকজন বললেন, সংবিধান অনুযায়ী, যথাসময়ে নির্বাচন হবেঅন্যজন বললেন, বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন হবে নাপ্রথম জনের পাল্টা বক্তব্য, এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ অনেকে থাকবেকোনো সমস্যা হবে নাদ্বিতীয় জন বললেন, এরশাদই বলে দিয়েছেন, আর দালাল হবেন না; বিএনপি না গেলে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে যাবে না

আলোচনা চলছে তো চলছেইনতুন নতুন ইস্যু আসছে; একজনের পর একজন ঝেড়েই যাচ্ছেনএল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গ; এ নিয়েও নানামুখী কথাএকজন বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নয়; আরেকজন বললেন, এখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার দরকারতত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন দেশে হবে না; হতে দেওয়া হবে নাপ্রথমজন বললেন, তুই তো খালেদা জিয়ার মতো কথা বলছিস! তা হবে নানির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই হবেএবার দ্বিতীয়জনের পাল্টা উত্তর, তুই তো প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মতো বলছিস

এই বিতর্কের মধ্যে এলেন আরও দুজনবসলেন, চায়ের অর্ডার দিলেনআর ওই দিকে তখনো দুজন চালাচ্ছিলেন তাদের বিতর্কনবাগত দুজনের একজন বললেন, ভাই, বাদ দেন এসব কথা; রাজনীতি তো এখন সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টেবিস্ময়ে হতবাক প্রথম দুই ঝগড়াকারী সমস্বরে জানতে চাইলেন, তার মানে? জবাব এল, সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদী ভাঙছে; আর সিরাজগঞ্জবাসীর হৃদয় দুরুদুরু কাঁপছেনবাগতদের দ্বিতীয় জন যোগ করলেন, রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের বিরোধ বাড়ছে; দেশবাসীর হৃদয় কাঁপছেসামনে কী হবে, আল্লাহ মালুম

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, রোজার ঈদের পর হাওয়া বদলের রাজনীতি চাঙা হলেও নির্ধারিত হয়নি গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যাবেবিরোধী দল দুর্বার আন্দোলনে যাবে নাকি নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ইলেকশন-রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তা-ও ঠিক হয়নিপরিস্থিতি অপরিবর্তিত; দৃশ্যত সংঘাতের দিকেই এগোচ্ছেনানামুখী প্রচেষ্টা থাকার পরও নাটকীয় কোনো ঘটনার সূত্রপাত হয়নিমাঠের ইশারা বুঝতে পারলেও ফল ঘরে তোলার বিষয়ে শঙ্কা থাকায় নির্বাচন থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপিকেউ কেউ এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বলছেন, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নিযেকোনো সময় নাটকীয় একটা কিছু হয়ে যেতে পারেসিলেটের জনসভায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনী কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন

আগামী নির্বাচন নিয়ে সরব দুই নেত্রী; আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসাম্প্রতিক সময়ে দুজনই যথাক্রমে আওয়ামী লীগের জনসভায় ও ১৮-দলীয় জোটের জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেনপ্রধানমন্ত্রী জোর দিচ্ছেন, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় তার সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ এবং এ সরকারের মেয়াদকালে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনে নিরপেক্ষতার ওপরতিনি সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচনের কথাও বলছেনআর বিরোধীদলীয় নেতা জোর দিচ্ছেন নির্দলীয় সরকার-ব্যবস্থার ওপরতিনি বলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে রেখে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে নাতত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন তিনি

রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলন বলছেন, সারা দেশ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুততারা সরকারের দুঃশাসন ও নানামুখী অপকর্মের কারণে এরই মধ্যে মহাজোট থেকে মুখ সরিয়ে নিয়েছেতবে নির্বাচনী মাঠের লড়াইয়ে মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার-ব্যবস্থা না থাকলে বদলে যাবে ভোটের হিসাবসে ক্ষেত্রে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচনে যাওয়া বিএনপি তথা বিরোধী দলের জন্য আত্মঘাতী হবেতিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনও এরই মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেদের কিছুটা বিতর্কিত করে ফেলেছেসরকারবিরোধী জোরালো আন্দোলন শুরু হলে নাটকীয় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশ রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথে এগোবে

তবে বিএনপির সাবেক সাংসদ মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ঘোষণা দিলে বিএনপিকে দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতেই থাকতে হবেতিনি দাবি করেন, সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেনির্বাচনে প্রতীক পেলেই তারা বিএনপির পক্ষে রায় দেবেকোটি মানুষের রায় কেউ বদলানোর ক্ষমতা কেউ রাখে না বলেও দাবি করেন মেজর আখতারুজ্জামান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব দিদারুল আলম চৌধুরী বলেন, বিএনপির বিভাগওয়ারি জনসভা, প্রতিটি জনসভায় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে কী করবেন তার ঘোষণা আর প্রার্থীকে ম্যাডামের সঙ্গে টিভি ফ্রেমে রাখাই প্রমাণ করে নির্বাচনের মাঠে অনুশীলন শুরু করেছে বিএনপিএখন কেবলই ম্যাচের জন্য অপেক্ষাতিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক ও নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে চাপ দিয়ে বিএনপি মূলত রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেতবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রেখে নির্বাচনে যাবে বলে মনে করেন না দিদারুল আলম চৌধুরীতার মতে, বিকল্প হিসেবে তারা রাষ্ট্রপতির অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কথা বলতে পারে

আওয়ামী লীগের সাংসদ মো. তাজুল ইসলাম তার নির্বাচনী এলাকা কুমিল্লার লাকসামের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, গ্রামীণ জনপদে নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছেতিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান তালে প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত বিএনপিমুখে যত হুংকার ও আন্দোলনের কথা বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে আসবে বলেই মনে করেন তাজুল ইসলাম এমপিআওয়ামী লীগের আরেক সাংসদ অ্যাডভোকেট সানজিদা খাতুন বলেছেন, বিএনপি ভেতরে ভেতরে প্রার্থী চূড়ান্ত করে তাদের মাঠে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেতার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৪-এ দৌড় সালাহউদ্দিন নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেনতিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি অস্তিত্বসংকটে পড়বে

তবে বিএনপি নেতা ও সাবেক সাংসদ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, সরকারি দলের এমপিরা যা-ই বলুক না কেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়টি ঠিক না হলে নির্বাচনে যাবে না তাদের দল ও ১৮-দলীয় জোটপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান রেখে নির্বাচনে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না বলে জানান তিনিবিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক তথ্যসচিব ব্যারিস্টার এম হায়দার আলী জানান, নির্বাচনের প্রস্তুতি বিএনপির রয়েছে; তার মানে এই নয় যে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে নির্বাচনে যাবে তার দলতিনি স্পষ্ট করে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা নির্দলীয় যে নামেই হোক, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বাইরে একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত হলেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি

আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক পরিবেশমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম মাঠ গরম করা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেননির্ধারিত সময়েই নির্বাচন, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবেতারা সবাই বিএনপিকে আন্দোলনের পথ পরিহার করে নির্বাচনমুখী হওয়ার পরামর্শ দেন

আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ সরব দুর্বার আন্দোলন ও তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়েতাদের বক্তব্য একটাই, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নির্বাচন হবে নাতত্ত্বাবধায়ক হোক আর নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা হোক, করতে হবে; না হলে লাগাতার আন্দোলন

বিএনপিতে নানা চড়াই-উতরাই পেরোনো নেতা ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা মনে করেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত সঠিকতার মতে, সরকার ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি; কেউ হারতে নারাজএ কারণেই সংকট জিইয়ে থাকছেএই পরিস্থিতি উত্তরণে জনগণকে দুই নেত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টির পরামর্শ দেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাতিনি আরেকটি বিষয়ে জোর দিয়েছেন, তা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন আহ্বান জানিয়েছেন,কথা বলেছেনকিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হয়নিপরিস্থিতি উত্তরণে ভারতের নীরবতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নাজমুল হুদা বলেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ভারত এগিয়ে এলে সমস্যার দ্রুত সমাধান বেরিয়ে আসবে

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এত দিন নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে জোরালো বক্তব্য রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে সুর পাল্টে এখন সব দল না গেলে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেনদালালির নির্বাচন আর নয়বলেও মন্তব্য করছেন এরশাদসরকারের নানা কর্মকাণ্ডের উচ্চকিত সমালোচনা করে এরশাদ বলছেন, নির্বাচনে বিএনপি না এলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না

জাতীয় পার্টির অবস্থানগত এই নাটকীয় পরিবর্তনকে নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সরস মন্তব্য করেছেনকেউ বলেছেন, এরশাদ আর ভুল করবেন না; কেউ আবার বলছেন, আন প্রেডিকটেবল ক্যারেক্টার এরশাদের; কী কারণে তিনি হঠাৎ সুর বদলালেন, পরিষ্কার হওয়া দরকারবিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা,এরশাদ এখন যে কথাই বলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে তার দল; তা নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হোক আর না হোক

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কবি ও সংগঠক গোলাম কাদের মনে করেন, রাজনীতির বিদ্যমান সংকট স্থির; খালেদা জিয়ার লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া আর শেখ হাসিনার লক্ষ্য ক্ষমতায় টিকে থাকাকেউই অবস্থান থেকে নড়তে নারাজএই বাস্তবতায় সমাধান সুদূরপরাহতনাটকীয় কোনো ঘটনায় কোনো না কোনো পক্ষকে ছাড় দিতে হবেআরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এ কে এম পাটোয়ারী মনে করেন, দেশে বিরাজমান সংকট নিরসনে সংলাপ সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা নেইসামনে অন্ধকার সিঁড়ি; কোথাও থেকে আলো আসার এখনো নিশ্চয়তা নেইঅনিবার্য সংঘাত সংঘর্ষ ও রক্তপাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দেশের মানুষ

 

লেখক: হেড অব নিউজ, মাই টিভি


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ