রাজনৈতিক বিবাদ | সময় বিচিত্রা
রাজনৈতিক বিবাদ
অঘোর মন্ডল
agor-mondol

উদ্বেগ। উৎকণ্ঠা। সংশয়। শঙ্কা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ঘিরে শব্দগুলো বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা যায়, বহুব্যবহারে শব্দগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। তার পরও সেই শব্দগুলো লিখতে হচ্ছে! কারণ, বাস্তব পরিস্থিতিতে ওই সব শব্দের বিকল্প কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষ, কেউই এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-সংশয়-শঙ্কামুক্ত বলে দাবি করতে পারবেন না। যদিও দু-একজন রাজনীতিবিদ টেলিভিশন ক্যামেরা দেখলে, তারস্বরে গলা চড়িয়ে রাজনৈতিক ক্যানভাসারের মতো আগামী নির্বাচনের গ্যারান্টি দিয়ে বেড়াচ্ছেন!

 

উদ্বেগ-সংসদের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ২৪ অক্টোবর। কিন্তু এরপর কী হবে?

 

উৎকণ্ঠা-সংসদের মেয়াদ শেষ হলে আবার কি উত্তপ্ত এবং একই সঙ্গে রক্তাক্ত হয়ে উঠবে রাজপথ!

 

সংশয়-রাজপথে আর রক্ত না ঝরিয়ে কি কোনো সমঝোতা হবে দুটো বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে?

 

শঙ্কা-আবার ফিরে আসবে না তো ২০০৬ সালের অক্টোবরের শেষ দিনগুলো! পরিণতি হিসেবে আবার ফিরে আসবে না তো ওয়ান ইলেভেনের মতো কোনো তারিখ!

 

এই উদ্বেগ থেকে মুক্ত থাকার আপাত কোনো লক্ষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্টরা সেই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি একটু অন্যরকম ভাষায় বোঝাতে গিয়ে লিখছেন, ‘সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না! কিংবা সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে এখনো অন্ধকার!’ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টক শোতে যেসব রাজনৈতিক ঝগড়া-বিবাদ হচ্ছে, সেখানেও কোনো আশার বাণী নেই! বরং সেই আলোচকদের অনেকের শারীরিক ভাষা বলে, অক্টোবরের আগেই বোধ হয় অক্টোবর এসে গেল! সেই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ শুধু বেড়ে যায় না, বেড়ে যায় তাদের রক্তচাপও। আবার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে দু-একজন সংসদ বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে এখনো আলোচনার সময় আছে। বিরোধী দল পার্লামেন্টে এসে আলোচনা করতে পারে। স্পিকার বলছেন, সরকার এবং বিরোধী দল আলোচনা করতে চাইলে তিনি সহায়তা করবেন। কিন্তু সেই সংসদে দাঁড়িয়েই আবার সরকার দলের দু-একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘ওদের সঙ্গে কিসের আলোচনা! ওদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হতে পারে না!’ এসব দেখা এবং শোনার পর আপনি যদি নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারেন; তাহলে ভাবতেই হবে পৃথিবীর সুখী মানুষদের একজন আপনি। কিন্তু আমাদের এই সমাজে সেই ‘একজন’-এর সংখ্যা কত? সমাজ, রাজনীতি সবই যখন অসুস্থ, সেখানে সুখী মানুষ খুঁজে বেড়ানো একধরনের বিলাসিতা! উদ্বেগ দূরে ঠেলে সেই বিলাসিতা কে দেখাবেন?

 

উৎকণ্ঠা দূর হবে এমন কোনো চিহ্ন দুরবিন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে। বরং সময় যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে উৎকণ্ঠা। সেটা শুধু বড় দুটো রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো সংলাপ, সমঝোতা হচ্ছে না বলে নয়। এই উৎকণ্ঠার আরও অনেক কারণ আছে। তার কিছু রাজনৈতিক, কিছু অরাজনৈতিক। অরাজনৈতিক কারণগুলো দূর করার দায়িত্ব নেবে রাজনৈতিক সরকার। সেই সরকার থাকবে কি না, সেটাও বড় এক প্রশ্ন। জাতীয় নির্বাচনের সময় যতই এগিয়ে আসছে, ততই প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে; নির্বাচনটা কীভাবে হবে? কোনো সরকারের অধীনে হবে? নাকি নির্বাচন নিয়ে অচলাবস্থা অন্য কোনো সরকারব্যবস্থাকে টেনে আনবে, যাকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হবে দেশের মানুষ। কথাটা অনস্বীকার্য যে এরকম অচল অবস্থার মধ্যে দিয়েই কিন্তু জন্ম হয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের। তাই অনিবার্যভাবে প্রশ্নটা উঠছে, আবারও তেমন কিছু! এই উৎকণ্ঠা দূর করার দায়িত্ব যাদের, সেই রাজনীতিবিদদের কথায় আশাবাদী হওয়ার কিছু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! তারা নৈশাহারে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের বাসায় দৌড়-লাফ-ঝাঁপ দিচ্ছেন বটে। কিন্তু সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা দূর হওয়ার মতো কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। বরং বিদেশি লোকজন শোনাচ্ছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিঘ্নত হলে তার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদেরই নিতে হবে। বিদেশি কূটনীতিক কিংবা বিভিন্ন দেশের এমপিরা যেসব কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন, তাতে উৎকণ্ঠা বেড়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকছে।

 

সংশয় জাগছে, নির্বাচন হবে তো? হলে কেমন হবে সেই নির্বাচন? সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন হবে কি? নাকি একতরফাভাবে ‘১৫ ফেব্রুয়ারি’-মার্কা নির্বাচন হবে! যে নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠবে। যে নির্বাচনে অনেক রক্তক্ষরণ হবে বাংলাদেশের হৃদয় থেকে! সেই সংশয়টা জোরালো হচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন বাংলাদেশের মাটিতে হতে দেওয়া হবে না। পাল্টা জবাব দিতে খুব বেশি সময় নেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি খুব জোরালো গলায়ই বলেছেন, ‘…নির্বাচন ঠেকানোর কোনো ক্ষমতা আপনার নেই…।’ রাজনৈতিক পেশি প্রদর্শনের আগাম ঘোষণাই কি দিয়ে রাখলেন দুই নেত্রী! এতে কি অবাধ-সুষ্ঠু, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো আভাস মিলছে? মনে হয় না। তাহলে সেই নির্বাচন নিয়ে সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যদিও দু-একজন আশাবাদী মানুষ বলেছেন; নির্বাচন হবে। দুটো দলকেই কিছু ছাড় দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। তারা বসবেন। গ্রহণযোগ্য একটা আপস তারা করবেন। যাতে নির্বাচনটা ঠিকঠাকমতো হয়। না হলে তাদেরই সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হবে। সেটা কি তারা জানেন? জানলে ভালো কথা। কারণ, ওয়ান ইলেভেনের পর আমাদের বহু রাজনৈতিক নেতা বলেছিলেন, ‘রাজনীতির পাঠশালা থেকে নতুন করে অনেক শিক্ষা পেলাম।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাদের সেই কথার কোনো প্রতিফলন কাজে নেই। সে কারণেই আজ এত সংশয় একটা সাধারণ নির্বাচন নিয়ে!

 

উদ্বেগ দূর হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে। উৎকণ্ঠাজনিত ‘রাজনৈতিক রক্তচাপ’ কমতে পারে, এমন কোনো মেডিসিনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না রাজনৈতিক দোকানগুলোতে! কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সংশয় দূর করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। বিশেষ করে, সরকার এবং প্রধান বিরোধী দলের ওপর। বিদেশি কূটনৈতিক, বিভিন্ন উন্নয়ন-সহযোগীরা সেই চাপটা তৈরি করছে। চাপ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবিটা তেমন। যদি তা-ই হয়, তাহলে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন দেশের মানুষ অস্বস্তিকর দমবন্ধ করা এই অবস্থার মধ্যেও। যদিও সেটা হবে আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে লজ্জা এবং অপমানের বিষয়। কারণ, বিদেশি মুরব্বিদের কথা তারা মানবেন, অথচ জনগণকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাখতে তারা সামান্য দ্বিধা করছেন না!

 

নির্বাচন নিয়ে যদি সংশয় থেকে যায়, তাহলে শঙ্কা, আগামী দিনগুলোতে কী হবে দেশে? এই প্রশ্নের উত্তর মানুষ খুঁজতে চায় না। মানুষ দেখতে চায়, সঠিক সময়ে সবার অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হবে। আমাদের নড়বড়ে গণতন্ত্রকে আরেকটু শক্ত করবে। এই নড়বড়ে গণতন্ত্রের পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো অগণতান্ত্রিক সরকার বা শক্তি দাপাদাপি করুক, তা দেশের মানুষ চায় না। কারণ, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের গণতন্ত্রের রুগ্ণ চেহারাটাই দেখে আসছে মানুষ। তাকে একটু পুষ্টি জোগান দেওয়ার দায়িত্ব যাদের ছিল, সেই রাজনীতিবিদরা নিজেদের আর দলীয় কর্মীদের স্বার্থের বাইরে গণতন্ত্রের কোনো চেহারা দেখতে পাননি! তাই প্রশ্ন, নির্বাচন হলেও আমাদের গণতন্ত্রের চেহারার কি কোনো পরিবর্তন হবে? না, আশাবাদী হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বরং শঙ্কিত হওয়ার আরও কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দুটো জোট কিংবা দুটো বড় দল সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ খুঁজে পেতে যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশ কি কোনো সাংবিধানিক সংকটে পড়বে? যদি পড়ে, তাহলে সেই সুযোগ কোনো অসাংবিধানিক সরকার নেবে কি? আর তাদের পথ বাতলে দিতে কিছু আইনজীবী, কিছু সংবিধান-বিশেষজ্ঞ, সাইনবোর্ড-সর্বস্ব কিছু রাজনৈতিক দলের নেতা মাঠে নামবেন। বিভিন্ন তত্ত্ব দেবেন। জনগণকে কিছু দিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখবেন। ঘুম ভাঙার পর জনগণ আবার ‘গণতন্ত্র গণতন্ত্র’ বলে রাজপথে নামবে। আবার আমাদের গণতন্ত্র মুক্ত হবে। আমরা উল্লসিত হব। আর আমাদের রাজনীতিবিদরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলবেন, ‘এ দেশের জনগণ ঠিক সময়ে জেগে ওঠে! বাংলার জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে না।’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

ভালো কথা। খুব ভালো কথা, জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে না। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা? তারা যে ভুল করেই যাচ্ছেন। যে কারণে এ দেশের মানুষের মন থেকে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দূর হচ্ছে না। বাড়ছে সংশয়, শঙ্কা। কিন্তু এভাবে কত দিন? গণতন্ত্র কেন বারবার রাজনৈতিক বিবাদের ‘বলি’ হবে?

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ