ইসির কর্মকাণ্ড নির্বাচন নিয়ে সংশয় | সময় বিচিত্রা
ইসির কর্মকাণ্ড নির্বাচন নিয়ে সংশয়
মাহবুব মাসুম
EC-2

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো আশার আলো জ্বালাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)বরং কমিশনের ভূমিকায় নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের মাত্রা দিন দিন আরও বেড়ে যাচ্ছেনিরপেক্ষ ও শক্তিশালী অবস্থানে থাকার বদলে ইসি অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেএকই সাথে মেরুদণ্ডতত্ত্ব নিয়েও ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে কমিশনকেউ বলছে, মেরুদণ্ডহীন কেউ বলছে মেরুদণ্ডে সমস্যা আছেআবার কেউ বলছে এদের ওপর সরকারি দলের আসর পড়েছেভাবসাবে মনে হচ্ছে, আজিজের পথেই হাঁটছে রকীবউদ্দীন আহমদের কমিশনপ্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকারের আজ্ঞাবহ ইসি মেরুদণ্ডহীনএদের দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্ভব নয়নির্বাচনের আগে এদের বিদায় নিতে হবেএর জবাবে জাবেদ আলী সম্প্রতি অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মিডিয়াকে বলেছেন, ইসির মেরুদণ্ড সোজাই আছে৬৩ বছর বয়সেও কোনো সমস্যা হচ্ছে নাচিলে কান নিয়েছে বলায় চিলের পিছনে ছুটছে ইসিমেরুদণ্ড যদি সোজাই থাকে তাহলে নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কেন? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে আচরণবিধি হচ্ছে না কেন? এসব নানা প্রশ্ন সামনে আসছেসবকিছু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটা আসলে মেরুদণ্ডে নয়কাজে-কর্মে সমস্যাএটাকেই মূলত বোঝাতে চেয়েছে বিরোধী দলবর্তমান কমিশনকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার উৎসাহ দেখে মনে হচ্ছে, সরকারের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নেই সাংবিধানিক মহান দায়িত্ব পালন করছেনসরকারের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন সাংবিধানের মধ্যে থেকেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা হবেরাজনৈতিক সমঝোতা বা নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির কোনো চেষ্টা এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি

বর্তমান সংবিধান যে নিজেদের সুবিধামতো বর্তমান সরকার তৈরি করেছে, তা মনে হয় বুঝেও না বোঝার ভান ধরেছে ইসিএই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে যে একতরফা নির্বাচন হবে তা দেশের মানুষ ভালো করে বুঝলেও কমিশন বুঝতে চাচ্ছে নাসাম্প্রতিক কার্যক্রমে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে ইসিবিএনপির বিকল্প শক্তি মাঠে নামাতে সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফকে নিবন্ধন দিতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে কমিশনপ্রাথমিক তদন্তে দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্ব না পেলেও আইন লঙ্ঘন করে তিন দফা সময় দিয়ে নিজেরাই শর্ত পূরণ করে দিচ্ছেশুধু তা-ই নয়, যেসব নির্বাচন কর্মকর্তা বিএনএফের সম্পর্কে নেতিবাচক রিপোর্ট দিয়েছেন, উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ইসিএক কথায় বিএনএফকে নিবন্ধন দিতে নগ্নভাবে কাজ করছে বর্তমান কমিশনএ নিয়ে অবশ্য বিএনপি তিন দফা কমিশনে এসে ভুঁইফোড় বিএনএফকে নিবন্ধন না দিতে ইসিকে অনুরোধ করেছেগত ২৩ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে বিতর্কিত এই সংগঠনটির বিলুপ্তি ঘোষণা করেছে সংগঠনটির আহ্বায়ক নাজমুল হুদাতার পরও নিবন্ধন দিলে ইসির বিরুদ্ধেই সামনে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন বিরোধী দলের নেত্রী

সম্প্রতি নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভাচলতি সংসদ অধিবেশনেই এটি পাশ হওয়ার কথা রয়েছেইতিমধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছেএটি সংশোধনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নিএর ফলে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অবাধভাবে অনুষ্ঠান নিয়ে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাএকই সাথে নির্বাচনী ব্যায় মনিটরিং প্রস্তাবনা বাদ দেওয়ায় আগামী নির্বাচনে কালোটাকার ছড়াছড়ি হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে গেছেএমনিতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছেএমপি থাকা অবস্থায় নির্বাচন করতে পারবে কি না তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছেএমপি পদ লাভজনক কি না, এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি ইসিনির্বাচনের সময় সরকার বহাল থাকলে কীভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করা হবে তা নিয়ে এখনো মাথা ঘামাচ্ছে না কমিশনঅথচ নির্বাচনের সময় বেশি দিন নেইসংবিধান অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে

কিন্তু বর্তমান আরপিও সংস্কার করে নির্বাচনী ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিবর্তে আরও দুর্বল করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেনআইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়েছেযা গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বহাল ছিলবিগত হুদা কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়বর্তমান কমিশন তা বাদ দেয়

এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীশব্দদ্বয় বাদ দেওয়া হয়েছেফলে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে সেনাবাহিনী থাকবে নাযদি সেনাবাহিনী অপরিহার্য হয়ে পড়ে তাদের মাঠে নামাতে গ্যাঁড়াকলে পড়বে কমিশনতখন কমিশনকে সিআরপিসি (দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিকিউটর, ১৮৯৮) অনুসরণ করতে হবেকী কারণে সেনাবাহিনী দরকার তার ব্যাখ্যা দিতে হবেজাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দেশের ৩০০টি আসনে এক দিনে নির্বাচন হয়দেশের ৪৫ হাজার ভোট কেন্দ্রে মোতায়েনের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি নেইপ্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে নিরাপত্তা দৃশ্যমান করতে মানুষের ভয় দূর করতে সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প থাকে নাকারণ, সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা সেনাবাহিনীর ওপর

এদিকে শামসুল হুদা কমিশনের রেখে যাওয়া স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্বাচনের সময় ইসির সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাবনাও বাদ দিয়েছে বর্তমান ইসিকমিশনকে শক্তিশালী এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচনী আইনের সংস্কার প্রস্তাব আমলে নেয়নি রকিবউদ্দীন আহমদের কমিশন

এ ছাড়া হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে তা যেকোনো সময় প্রমাণিত হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে, এ ধারাও বাদ দেওয়া হয়েছেএতে হলফনামার ৮টি শর্তে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য দেওয়ার অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে

দ্বিধা বিভক্ত ইসি

বিএনএফসহ নানা ইস্যুতে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ছে নির্বাচন কমিশনকমিশন সচিবের পাশাপাশি কমিশনাররাও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেনবিএনএফকে নিবন্ধন দেওয়া, সংসদ নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা তৈরি ও মধ্য জানুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন করা, এসব বিষয়ে দ্বন্দ্ব দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করেছেনির্বাচন কমিশনের শীর্ষপর্যায়ে এ ধরনের বিরোধ আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছেএ ছাড়া গেল মাসে আচরণবিধি লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে আরপিওর ৯১-ই ধারা বহাল ও বিলুপ্ত ইস্যুতে কমিশনারদের মধ্যে চরম মতবিরোধ দেখা দেয়এ কারণে শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে কমিশনবেআইনিভাবে বিএনএফকে নিবন্ধন না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয় নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ অবু হাফিজ ও মো. শাহ নেওয়াজএ দুই কমিশনার মূলত বিতর্কিত কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াতে চাচ্ছেন না

ইসি যে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের অবস্থানকেই সমর্থন করছেন তা নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারকের বক্তব্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছেকমিশনে আইনজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এ কমিশনার গত ইসির প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী দেশ ও জাতি মেনে নিয়েছেকারণ, এ সংশোধনী নিয়ে আদালতে কোনো চ্যালেঞ্জ হয়নিএ সংবিধান এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইন (আরপিও) অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো বাধা নেইদায়িত্বশীল কমিশনারের এমন বক্তব্য গোটা জাতিকে হতাশ করেছে বলে নির্বাচন বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছেসেসব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগেই কমিশনের কার্যকলাপে নতুন নতুন আরও অনেক প্রশ্নের জন্ম হচ্ছে এবং তা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে যে শঙ্কা, তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে

বিদেশিদের চাপের মুখে ইসি

অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিদেশিদের প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে ইসিসবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে আগামী নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না বলে ১১ সেপ্টেম্বর বৈঠকে কমিশনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নএর আগে গত ২৭ আগস্ট প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে একই ধরনের চাপের মুখে পড়ে কমিশন

এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেছেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবেসংবিধান অনুযায়ী সংসদ রেখে নির্বাচন করার চেয়ে ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করলে ইসির জন্য সহজ হবেসম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদও দশম সংসদ নির্বাচনের সময়কে অত্যন্ত কঠিন সময়উল্লেখ করেছেন


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ