বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো দরকার | সময় বিচিত্রা
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো দরকার
সময় বিচিত্রা
Buriganga

দূষণ, দখল আর অচলের হাত থেকে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো দরকার। যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ঐতিহ্যর নগর ঢাকা, দখল আর দূষণের শিকার হয়ে এ নদীই এখন দুর্ভাগা। ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাস গড়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার বাঁকে বাঁকে। পুরান ঢাকাবাসীর গর্ব বুড়িগঙ্গা নদীর পরিচয় হারিয়ে হয়েছে নর্দমা। বুড়িগঙ্গার পানি আর পানি নেই। বিষ হয়ে গেছে। খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ঢাকাবাসী যে নদীর তীরে যেত, এখন নাক চেপে সেই বুড়িগঙ্গা থেকে দূরে থাকে ঢাকাবাসী। এতটাই বিষাক্ত হয়ে পড়েছে যে না দেখলে কোনোভাবেই বিশ্বাস করানো যাবে না। একবার কোনো প্রকৃতিপ্রেমী এই নদীটির দিকে তাকালে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না।

 

দখল আর দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা নদীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার বাকি নেই। মৃত সরীসৃপের মতো পড়ে আছে খরস্রোতা রাজধানীর ধমনি বুড়িগঙ্গা। কোটি মানুষের চোখের সামনেই কালের সাক্ষী বুড়িগঙ্গা মরে যাচ্ছে। অথচ কারোর দৃষ্টি নেই সেদিকে। অবস্থা এমনই পর্যায়ে যে, ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচাও’ বলে হƒদয়বিদারক আর্তনাদ করেও হয়তো আর লাভ হবে না। পলিথিন, ট্যানারিসহ শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল-ক্লিনিকের পরিত্যক্ত কেমিক্যাল, লঞ্চ-জাহাজের পোড়া তেল-মবিল, টনকে টন বিষ্ঠা বুড়িগঙ্গাকে বিষাক্ত  জলাশয়ে পরিণত করেছে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাবে কে? সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নদীর এ অবস্থার জন্য একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে। নদী ও পরিবেশবিদেরা বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলো এ নদী নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা করছে। বুড়িগঙ্গা বিলীন হলে রাজধানী ঢাকা শহরও যে একদিন বিলীন হবে, এ কথা এখনো কেউ ভাবছে না।

 

মাত্র ৫০ বছর আগেও বিকেল-সন্ধ্যায় আশপাশের এলাকার মানুষ ছুটে যেত বুড়িগঙ্গার নির্মল বায়ু সেবনের জন্য। অনেকে নৌকা ভাড়া করে বুড়িগঙ্গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়াত। সেই সদরঘাট, সোয়ারীঘাট কিংবা বাকল্যান্ড বাঁধের ধারে ভ্রমণ আর নির্মল বায়ুসেবন এখন অকল্পনীয়। সদরঘাটসহ নদীর আশপাশে কেউ প্রবেশ করলে নাকে রুমাল গোঁজা ছাড়া উপায় নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর ১০ বছর আগেই বুড়িগঙ্গার পানি ভয়াবহ ঘোষণা করে তা যেকোনো কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। একসময় যে বুড়িগঙ্গা ছিল রাজধানী ঢাকার প্রাণপ্রবাহ, আজ তা পরিণত হয়েছে জনস্বাস্থ্যের হুমকির উৎসে। বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, নিক্ষিপ্ত বর্জ্যরে চাপে ঐতিহাসিক এ নদীর জীবন থমকে গেছে। একে বাঁচাতে না পারলে রাজধানী ও আশপাশের নাগরিক জীবনেও নেমে আসবে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়। তারা এ-ও বলেছেন, এ নিয়ে অনেক কথা ও সময় নষ্ট হয়েছে। এখন কার্যকর উদ্যোগ দরকার। বুড়িগঙ্গা আকারে অনেক বড় না হলেও ৪০০ বছরের পুরোনো রাজধানী ঢাকার পাদদেশে পানি সিঞ্চন করে ইতিহাসে উজ্জ্বল স্থান করে নিয়েছে। নিকট অতীতেও এ নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ আসত, পালতোলা নৌকা চলত নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে, ছিল প্রাণের স্পন্দন। কালের আবর্তে তা আজ রূপ-রস ও ঐতিহ্য হারিয়ে মরা, আবর্জনার ভাগাড় ও বিষাক্ত নদীতে পরিণত হয়েছে। ঢাকার মিরপুর ব্রিজ থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটারজুড়ে নদীর পানি বিবর্ণ ও দুর্গন্ধময় হয়ে পড়েছে।

 

বিষাক্ত বর্জ্য :

 

প্রতিদিন ৪৯টি রুটের প্রায় ১৭৫টির বেশি লঞ্চ, স্টিমার বুড়িগঙ্গা নদীতে ১ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন টন বর্জ্য ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই পরিমাণ বর্জ্য থেকে টনকে টন রাসায়নিক পদার্থ পলি হিসেবে নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে প্রায় ১০ ফুট বিষাক্ত বর্জ্য ও পলিথিনের স্তর জমে গেছে। সাধারণত প্রতি লিটার পানিতে ৬ মিলিগ্রামের নিচে বায়োলজিক্যাল ডিমান্ড (বিওডি) থাকার কথা। বিওডি ৬ মিলিগ্রামের বেশি হয়ে গেলে সেখানে কোনো জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে থাকবে না। বিওডি থাকার কথা প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলিগ্রামের ওপরে। এর নিচে নেমে গেলে তা প্রাণীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবেশ অধিদপ্তর বুড়িগঙ্গা নদীর মিরপুর ব্রিজ, কামরাঙ্গীরচর, চাঁদনীঘাট, সদরঘাট, ফরাশগঞ্জ, ধোলাইখাল, চীন মৈত্রী সেতু, হাজারীবাগ এলাকার পানি পরীক্ষা করে দেখেছে, এসব এলাকার প্রতি লিটার পানিতে বিওডি যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ২, ১৮ দশমিক ৬, ২২, ২৪, ২৬ দশমিক ২, ২৮ দশমিক ৪, ১২ দশমিক ৮, ৩০, ৪৫, ৩৩ মিলিগ্রাম। এ ছাড়া যেখানে ডিজলভড অপ্টিজেন থাকার কথা প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলিগ্রামের বেশি, সেখানে বর্তমানে বুড়িগঙ্গার পানিতে কোনো ডিজলভড অপ্টিজেন নেই বললেই চলে। শুধু চীন মৈত্রী সেতুর কাছের পানি পরীক্ষা করে দশমিক ৮ মিলিগ্রাম অপ্টিজেন পাওয়া গেছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর সিসার পরিমাণ পানিতে বেড়ে চলেছে।

 

শিল্প ও পয়োবর্জ্য

 

প্রতিদিন ১০ হাজার ঘনমিটারের বেশি শিল্পবর্জ্যসহ কাঁচাবাজার, গৃহস্থালি ও হাসপাতালের বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এসবের সঙ্গে রয়েছে নগরের সোয়া ১ কোটির বেশি মানুষের পয়োবর্জ্য, যার ২০ শতাংশ পরিশোধিত এবং ৪০ শতাংশ সেপটিক ট্যাংকের মাধ্যমে আংশিক পরিশোধিত এবং বাকি ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত। সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরের গৃহস্থালি ও অন্যান্য শিল্প থেকে প্রতিদিন ৭ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ অপরিশোধিত সলিড বর্জ্য বিভিন্ন সংযোগ খালের মধ্য দিয়ে বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। এ ছাড়া ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম এমনকি পারদের মতো ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্যরে ভারে নদীর অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা পরিশোধন করেও এর পানি পান করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ১০ হাজার গার্মেন্টস, ডায়িং, ওয়াশিং, প্লাস্টিক, পলিথিন, চামড়া কারখানা রয়েছে। এ কারখানাগুলোর অধিকাংশের তরল বর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারখানাগুলো থেকে বিষাক্ত কেমিক্যাল-মিশ্রিত তরল বর্জ্য প্রতিদিন বুড়িগঙ্গায় পড়ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর ঢাকা অংশে দুটি বড় খালসহ অর্ধশত পাইপ রয়েছে, যেগুলো থেকে ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত পানি নদীতে পড়ছে। একইভাবে নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ থেকে ২৫-৩০টি খালের মধ্য দিয়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল-মিশ্রিত পানি বুড়িগঙ্গায় পড়ছে।

 

সরেজমিন বুড়িগঙ্গা ঘুরে দেখা গেছে, এ নদীর পানি এত কালো এবং কুশ্রী হয়ে গেছে যে স্বাভাবিকভাবে পানির দিকে তাকানো যায় না। বুড়িগঙ্গায় দীর্ঘদিন শ্যালো নৌকা চালাচ্ছেন এ রকম নৌকার মাঝি ফরিদ হোসেন বলেন, পানি গায়ে লাগলে চুলকানি শুরু হয়ে যায়। তাই তারা হাতে-পায়ে প্লাস্টিকের গ্লাভস পরে নৌকা চালাচ্ছেন। সকালে হাতে-পায়ে তেল মেখে নদীতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নদীর দুই পাড়ের মানুষ এ পানি ব্যবহার করার কারণে প্রায় সবাই এখন নানা ধরনের চর্মরোগে ভুগছেন। অনেকের হাতে-পায়ে ঘা হয়ে গেছে।

 

মাছশূন্য বুড়িগঙ্গা

 

আগে এ নদীতে অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন প্রায় মাছশূন্য। স্থানীয়রা বলেন, বুড়িগঙ্গা নদীর পানি এখন এত বিষাক্ত হয়ে গেছে কোনো জাহাজ যদি একনাগাড়ে এক মাস এ পানিতে থাকে তাহলে ওই জাহাজ কিংবা লঞ্চ চালানোর অযোগ্য হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিষাক্ততা ও সিসার কারণে জাহাজের তলদেশ ক্ষয় হয়ে যায়। মেশিনে যদি নদীর পানি পড়ে তাহলে মুহূর্তে সেই মেশিনে মরিচা ধরে।

 

দখলের তালিকায় প্রভাবশালীরা

 

কথায় আছে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা। পানিদূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে নদী দখলের প্রতিযোগিতা। এর ফলে বুড়িগঙ্গার প্রস্থ দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। বুড়িগঙ্গা দখলের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। যে দল যখন ক্ষমতাই থাকে, তখন সেই দলের প্রভাশালী লোকজন দখলদারিত্বে মেতে ওঠেন। গত এক দশকে বুড়িগঙ্গা থেকে দখলদার উচ্ছেদের জন্য কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে। তার পরও প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে তাদের দখল অব্যাহত রেখেছে। স্থানীয়রা বলছেন, একদিক থেকে উচ্ছেদ শুরু হলে তা শেষ না হতেই আবার শুরু হয়ে যায় দখল। ঢাকা রক্ষা বাঁধ থেকে পাগলা পর্যন্ত এখনো অসংখ্য স্থাপনা বুড়িগঙ্গাকে দখল করে রেখেছে।

 

প্রতিদিন মিশছে বর্জ্য

 

পরিবেশ অধিদপ্তর, বুয়েট ও ঢাকা ওয়াসার একাধিক জরিপ থেকে জানা যায়, অপরিকল্পিত উপায়ে ২৫ হেক্টর জমির ওপর গড়ে ওঠা হাজারীবাগের দুই শতাধিক ট্যানারি থেকে প্রতিদিন বুড়িগঙ্গার বুকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সাড়ে ৪৭ লাখ মিটার তরল বর্জ্য এবং ৯৫ টন কঠিন বর্জ্য। প্রতিদিন প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে কমবেশি ২৫০ টন চামড়া। ট্যানারি বর্জ্য অত্যন্ত বিষাক্ত। এ শিল্প থেকে নির্গত কঠিন বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে লেদার কাটিং, ফ্লেশিং, লোম, চুন ও ক্রোমিয়াম। তরল বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে দ্রবীভূত চুন, হাইড্রোজেন সালফাইড অ্যাসিড, ক্রোমিয়াম, তেল ও গ্রিজ-জাতীয় পদার্থ। ওই বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক বর্জ্য কোনোরূপ শোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় পানি ভয়াবহ দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ও আশপাশের অনেক এলাকার পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থাও এ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। সোয়ারীঘাটের মাছের আড়ত, বাদামতলী ও শ্যামবাজারের ছোট-বড় অনেক ফলের আড়ত এবং নদীর তীরবর্তী অসংখ্য হাটবাজারের আবর্জনা সরাসরি ফেলা হচ্ছে পানিতে। পাগলার কাছে বুড়িগঙ্গার উভয় পাড়ে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক ইটের ভাটা। এসব ভাটার আবর্জনা ও ভাঙা ইটের টুকরায় নদীর পানি দূষণসহ তলদেশ ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া শ্যামপুর, ফতুল্লাসহ নদীর দুই পাড়ের অসংখ্য বিপণিকেন্দ্র, প্রিন্টিং, ডায়িং, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বসতবাড়ি, কলকারখানা, কাঁচা পায়খানা, অসংখ্য নৌযান থেকে নির্গত তেল, মবিল, ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের হাজার হাজার টন দূষিত ও বিষাক্ত আবর্জনা বুড়িগঙ্গার পানিকে বিষিয়ে তুলেছে।

 

গত বছর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বুড়িগঙ্গার নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি নির্ধারিত এলাকা থেকে বর্জ্য উত্তোলন করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ কর্মী  না থাকায় তা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়। বুড়িগঙ্গা দূষণে প্রধান দায়ী হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের উদ্যোগ ‘যাচ্ছে’-‘যাবে’র মধ্যে আটকে রয়েছে।

 

মানা হচ্ছে না আদালতের নির্দেশনা

 

আদালতের নির্দেশনা, সরকারের নজরদারি কোনো কিছুই কাজে আসেনি বুড়িগঙ্গা রক্ষায়। থেমে নেই বুড়িগঙ্গা দখল ও দূষণ। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নদীতীরে পায়ে হাঁটার পথ নির্মাণের কথা থাকলেও এ কাজ শুরু হয়নি এখনো। সীমানা পিলার স্থাপন নিয়েও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। দূষণ রোধে পুলিশ মোতায়েনে আদালতের নির্দেশ, নদী রক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ-কোনো উদ্যোগ সফল হয়নি। ঢাকার চারটি নদী রক্ষায় আদালত সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা বাস্তবায়নে দুই দফা সময় নিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। উচ্চ আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী বুড়িগঙ্গাসহ চার নদীর সীমানা নির্ধারণ, নদী সীমানায় জমে থাকা বালু, মাটি, ভাঙা ইট বা সুরকি অপসারণ এবং নদীর তীরে হাঁটার পথ নির্মাণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নদীতীরে বনায়নেরও নির্দেশ দেন আদালত। এখনো কোনোটিই বাস্তবায়ন করা হয়নি। গত বছর আদালত নদীর তীরবর্তী ছয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নদী দূষণমুক্ত রাখতে পুলিশ মোতায়েনের নির্দেশ দেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের নেতৃত্বে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চার নদী রক্ষায় গঠিত হয় নদ-নদী রক্ষা টাস্কফোর্স। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই ।

 

যমুনা থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গা নদীর সব বর্জ্য ফ্ল্যাশ করে মেঘনায় ফেলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে এ বছরের মধ্যে পুরোপুরি দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। সেই সঙ্গে এর প্রবাহ বাড়বে বলেও দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। তবে এ প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এভাবে নদীদূষণ কমানোর উদ্যোগ সফল হতে পারে না। পরিবেশ আইন কার্যকরের মাধ্যমেই দূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের কর্মকর্তা প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম বলেন, বুড়িগঙ্গাকে রক্ষা করতে হলে নদীর দুই তীরে পিলার দিয়ে নদীর সীমানা চিহ্নিত করে দিতে হবে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, দখলদারদের উচ্ছেদের পর প্রথম কাজটি করতে হবে নদীর ধারে গাছ লাগিয়ে রাস্তা করে দেওয়া। এতে একই জায়গা পুনরায় দখল হবে না।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিন বলেন, বুড়িগঙ্গাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা নদীর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়ার্ড কমিশনার অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান জড়িত। এদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। নদী ও নদীর পানি রক্ষা করতে হলে এসব সংস্থার মধ্যে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও টাস্কফোর্সের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার কী দায়িত্ব তা শুধু লিপিবদ্ধ রয়েছে।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ