শ্বেতভবন ত্রুল্লির শহর আলবেরোবেল্লো | সময় বিচিত্রা
শ্বেতভবন ত্রুল্লির শহর আলবেরোবেল্লো
শিপ্রা রায়
shipra

ইতালির বারি প্রদেশের পুগ্লিয়া অঞ্চলের একটি ছোট শহর আলবেরোবেল্লো। ত্রুল্লি নামে শ্বেতপাথরের তৈরি শহরটির এক অন্যরকম সৌন্দর্য। এটি ইউরোপের স্বদেশীয় স্থাপত্য ও সংরক্ষণের একটি অসাধারণ প্রাগৈতিহাসিক ইমারতের সাক্ষী। ১৯৯৬ সাল থেকে শহরটি স্থান করে নিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে ইত্রিয়া উপত্যকায় থোলস নামের ঐতিহ্যবাহী গম্বুজাকার সমাধি থেকেই এই ভবনের সূত্রপাত। টারান্টের রাজকুমার তার অনুগামীদের নিয়ে এই ইত্রিয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং নিজেদের বাস ভবন নির্মাণ করে যাদের ইতালিয়ান ভাষায় বলে ক্যাজাল্যে যার বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় বাক্স। বর্তমান যুগের ত্রুল্লিগুলোর সূচনা ঘটে চতুর্দশ শতকে। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি আলবেরোবেল্লোর মন্টি অঞ্চলে ৪০টির মত ত্র“ল্লি ছিল। ১৬২০ সালের দিকে এর বিস্তার শুরু হয় এবং অষ্টাদশ শতকের শেষে এর লোকসংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। এরপর নতুন ভবন নির্মাণের হার ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। ভবনগুলো সরাসরি পাথরের ওপর কোনো ভিত্তি ছাড়াই ড্রাইস্টোন টেকনিকে গঠন করা হয়েছে। ড্রাইস্টোন বা বাছাইকৃত ইন্টারলকিং পাথরের পরস্পরের সংযোগস্থাপন রয়েছে এই স্থাপনাটিতে। গোলাকার বা মোচাকৃতি পিরামিড আকৃতির ছাদ কাল পাথরের তৈরি। আয়তাকার গঠনের ঘর, শ্বেতপাথরের দ্বি-স্তরবিশিষ্ট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ও ছোট জানালা দিয়ে সজ্জিত। ইন্টেরিয়র আনুষঙ্গিক কাষ্ঠনির্মিত, জানালার ফ্রেম বা দ্বিতল ভবনের মেঝে ও সিঁড়ি কাঠের তৈরি। আলবেরোবেল্লো শহরটি আয়া পিকোলা ও মন্টি নামে দুটি রিয়নে বা ওয়ার্ডে বিভক্ত। শৈলপ্রান্তে ৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে মন্টি অঞ্চলে বর্তমানে মোট ১ হাজার ৩০টি ত্রুল্লি আছে। এখানে বিভিন্ন রকমের দোকান, হোটেল বা ক্যাফে, বাস ও গাড়ি চলাচলের আধুনিক রাস্তাসহ জীবিকা নির্বাহের প্রায় সবকিছু সহজলভ্য। আয়া পিকোলা অঞ্চলে মোট ৫৯০টির মতো ত্রুল্লি আছে। এই অঞ্চলটির ত্রুল্লি অকৃত্রিম ও ব্যক্তিগত সৌরভে স্নিগ্ধ। এখানে কোনো দোকান নেই বা গাড়ি চলে না। বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল ইতিহাসের সহজ সরল সংস্কৃতির স্বাদে ও একান্ত কিছু মুহূর্তের বিলাসে আয়া পিকোলার পরিচয়। আলবেরোবেল্লো শহরটিতে কাটানো এক ঘণ্টায় আমি ছোট-বড় অনেক সাদা ধবধবে বাড়ির ভিড়ে দেখলাম মিউজিয়াম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন হিসেবে ব্যবহৃত একমাত্র দ্বিতল ভবন ‘ত্রুল্লি সাভ্রানো’, আর্ট গ্যালারি হিসেবে ব্যবহৃত চতুর্দশ শতকের ড্রাইস্টোন টেকনিক ও ঊনবিংশ শতাব্দীর স্থাপত্যের সমন্বয়ে ‘দামোরে’, ত্রুল্লি আকৃতির রোমান ক্যাথলিক চার্চ, দ্য সেন্ট ডক্টরস ব্যাসিলিকা, মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত ‘পেজোল্লা হাউস’, অলিভ অয়েল মিউজিয়াম এবং ওয়াইন মিউজিয়াম। কিছু কিছু স্যুভেনির শপ চোখে পড়ে যেখানে বিভিন্ন আকৃতির পাথর, কাচের বা প্লাস্টিকের ত্রুল্লিসহ নানা ধরনের স্যুভেনির পাওয়া যায়। আমি একটি ছোট আকৃতির পাথরের ত্রুল্লি কিনলাম। তখন আকাশে ভরা চাঁদ, জ্যোৎস্নার রুপালি আলোয় শুভ্র শহর যেন আত্মপ্রকাশ করছে অলীক মূর্ছনায়। দূর থেকে ভেসে আসা ইতালীয় সুরের লহর, নীরব শহরের বুকে নিজেদের সাথে আসা পথিকের পদধ্বনি, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা প্রাচীন ইমারত আর তার সাথে সাথে গুঞ্জরিত প্রাগৈতিহাসিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বার্তা আমাকে একনিমেষে নিয়ে গেল কয়েক শতাব্দী পেছনে। চাঁদের আলোয় সেই মুহূর্তের স্বাদ যেন কোনো অন্য পৃথিবীর, অন্য জীবনের, অন্য জন্মের। নিজেকে মনে হলো ইত্রিয়া উপত্যকার কোনো রানি আর আমার পাশে হাতে হাত ধরে আমার রাজা। এ আমার অন্য জগতের মধুচন্দিমা।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ