আত্মহননের চেষ্টাকারী নয়, দরকার প্ররোচনাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা | সময় বিচিত্রা
আত্মহননের চেষ্টাকারী নয়, দরকার প্ররোচনাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা
কাজী রুনা

ওকে ঘিরে ছিল অনেক ছোট ছোট স্বপ্ন। জন্মের পর প্রথম কান্না, একটু করে বড় হওয়া, গুটি গুটি পায়ে হাঁটা, আধো আধো করে কথা বলা-প্রথম বলতে শেখা ‘মা’, হয়তো সে স্মৃতিই বারবার খুঁজে ফিরছিলেন পাগলপ্রায় মা। কিছুক্ষণ আগেই জানতে পেরেছেন টানা তিন দিন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হেরে গিয়েছে চাঁদের মতো ছোট্ট মেয়েটি। এমন সংবাদ একদমই সইতে পারেননি মা। নিজের বাসার পঞ্চম তলা থেকে লাফ দেন তিনি। উদ্দেশ্য একমাত্র মেয়ে চন্দ্রের কাছেই শেষ ঠিকানা বেছে নেবেন। হ্যাঁ, চন্দ্রমুখী ও মা সাংবাদিক নাজনীন আখতারের ট্র্যাজিক ঘটনা এটি। সাংবাদিক নাজনীন আখতার, যিনি ছুটেছেন সংবাদের পেছনে, এমন ঘটনাই তিনি নিজেই হয়ে গেলেন সংবাদের শিরোনাম। পরদিন সব জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘মেয়ের মৃত্যুসংবাদে মায়ের আত্মহত্যার চেষ্টা’।

 

গুরুতর আহত অবস্থায় নাজনীনকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে; সেখানে তাকে রাখা হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। সারা শরীরে অসংখ্য আঘাত নিয়ে এখনো চিকিৎসাধীন নাজনীন। তবে শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মনের কষ্ট অনেক বেশি। অচেতন মনে শুধুই বলে যাচ্ছিলেন, ‘আমি চন্দ্রের কাছে যাব।’ বর্তমানে নাজনীন অনেকটা আশঙ্কামুক্ত। আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে তাকে। স্বজন ও সহকর্মীরা আশা করছেন, নাজনীন সুস্থ হয়ে আবারও সবার মাঝে ফিরে আসবেন। মেয়ের শোক সামলে উঠবে ধীরে ধীরে, ওপার থেকে মেয়েই জোগাবে প্রেরণা; বলবে, ‘মা, আমার জন্য জিইয়ে রাখা ভালোবাসাটুকু ছড়িয়ে দাও সবার মাঝে। সবার মাঝে সুখ খুঁজে নাও। আমার বাবাকে সাহস জোগাও, হতবিহ্বল হয়ো না কিন্তু। ধৈর্য ধরো, ছড়িয়ে দাও সবার মাঝে ভালোবাসা।’

 

মূলত আত্মহত্যা চরম মানসিক বিপর্যয়ের ফল। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া আত্মহত্যার সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে, আত্মহত্যা বা আত্মহনন হচ্ছে একজন নর কিংবা নারী কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ডাক্তার বা চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। যখন কোনো ব্যক্তি জীবনের প্রতি এতটাই অতিষ্ঠ হয় যে কোনোভাবেই সে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায় না, কেবল তখনই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। হয়তো বা মেয়ের মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত করেছে যে কোনোভাবেই নাজনীন তার জীবনকে আর বয়ে বেড়াতে চাননি। এ ধরনের আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা, সন্তানের প্রতি মায়ের অপরিসীম ভালোবাসার এক অভাবনীয় নিদর্শন।

 

সাধারণত যারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ এবং নারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,  প্রতিবছর প্রায় দশ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। অন্য এক হিসাবে দেখা গেছে যে যেসব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। কিশোর-কিশোরী আর যাদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে, তাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে আত্মহত্যা। এদের মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭ থেকে ৯৮ শতাংশ আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয়। পুলিশের এক হিসাবে দেখা গেছে, এসব তরুণ এবং নারীরা যেসব কারণে আত্মহত্যা করে তার মধ্যে রয়েছে যৌতুক, নির্যাতন, বখাটের অত্যাচার, আর্থিক কলহ এবং পারিবারিক কারণ। এদিকে নৌকাবাইচকে ঘিরে আইন বলছে, আত্মহননের চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ আবার কাউকে আত্মহননের পথে ঠেলে দেওয়া বড় অপরাধ, যার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

 

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। আত্মহননের চেষ্টার অভিযোগে ওই ব্যক্তিকে এক বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে আত্মহত্যার সহায়তা বা প্ররোচনাকারীকে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

 

অনেক ক্ষেত্রেই আইন রসকষহীন নিয়মকানুন মাত্র। যে মানুষের জন্য আইনের প্রচলন সে মানুষেরই আবেগ, ভালোবাসা কোনো কিছুরই যেন দাম নেই এখানে। কেননা যারা আত্মহননের পথ বেছে নেন, তারা সাংবাদিক নাজনীনের মতো কোনো না কোনোভাবে আবেগ ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। নাজনীন যেমন প্রিয় সন্তানের চলে যাওয়া সইতে না পেরে পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়েছিলেন অবলীলায়, তেমনি কেউ কেউ ভালোবাসার কিংবা নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে পাওয়া চরম আঘাত পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাহলে তাদের জন্য কেন এই দণ্ডের বিধান? যার কাছে জীবনেরই কোনো মূল্য নেই, তার কাছে এই দণ্ডের কী অর্থ বহন করে?

 

তবে আশার কথা হলো, এমন একটি দণ্ডের বিধান থাকলেও তা মানা হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তাই এ আইনটি সম্পর্কে অনেকেই জ্ঞাত নয়। তাদের মতে, মানবিক কারণে যে আইনের বিধান কার্যকর করা সম্ভব হয় না, তা বিদ্যমান থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাদের মতে, আত্মহত্যার চেষ্টাকারীকে নয়, বরং প্ররোচনাকারীকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কেননা আত্মহত্যাকারী অন্যের দ্বারা চরম আঘাত পেয়ে শেষ করার সিদ্ধান্ত নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে আত্মহত্যার ঘটনা বেশি ঘটছে প্রতারণার শিকার হয়ে, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে প্রধান কারণ যৌতুক। এ ছাড়া বখাটেদের উত্ত্যক্তের কারণে কিশোরীরা আত্মহত্যা করে সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে কথিত সে প্রেমিকই হোক বা স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারই হোক অথবা বখাটেদের উত্ত্যক্তই হোক, যার কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন তিনি অবশ্যই প্ররোচনাকারী। আইনের আওতায় এনে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে কেউ শাস্তি পেয়েছেন এরকম নজির বিরল। যদিও দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার সহায়তা বা প্ররোচনাকারীকে দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ বিধানের আওতায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার মামলা করলেও আদতে এর আওতায় শাস্তির বিধান কার্যকর হয় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। তাই দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টাকারীকে শাস্তির আওতায় আনা সাংঘর্ষিক বিধায় তা বাতিলের দাবি রাখেন অনেকেই। তেমনি ৩০৬ ধারার বিধান অর্থাৎ প্ররোচনাকারীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত বলে মনে করেন সব শ্রেণীর মানুষ। তাদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নয়, যাদের জন্য অন্যে নিজেকে হত্যা করতে বাধ্য হয়, তাদের কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ