পেঁয়াজের ঝাঁজ আর রাজনৈতিক জেদের গ্যাঁড়াকলে ঈদ | সময় বিচিত্রা
পেঁয়াজের ঝাঁজ আর রাজনৈতিক জেদের গ্যাঁড়াকলে ঈদ
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী
poccod-saifu-alom-chow

মাস খানেক কিংবা তার বেশি সময় ধরে বাজারে পেঁয়াজের দামের ঝাঁজটা অনেক বেশি। ভারতের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ায় দেশটির সরকার নিজ দেশের অবস্থা ঠিক রাখতে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের জন্য অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। এতে আমাদের দেশে পেঁয়াজের দাম হু-হু করে বেড়ে যায়। ৩০-৪০ টাকার পেঁয়াজের কেজি গিয়ে একশো কিংবা তার বেশিতে ঠেকে। পেঁয়াজের ঝাঁজ লাগে পত্রিকা-টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যমের খবরে, টনক নড়ে আমাদের সরকারের। আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার পাশাপাশি সরকার মাঠে নামায় টিসিবিকে। ভর্তুকি দিয়ে পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি করে পরিস্থিতি সাময়িক সামাল দেওয়া গেলেও সামনের কোরবানির ঈদে পেঁয়াজের দাম শুনে যে আবার মানুষের চোখে জল আসবে না, সেটা বলা মুশকিল। সাথে যদি গরু কিংবা কোরবানির পশুর দাম চড়া হয়, তাহলে মানুষের অবস্থা আরও নাকাল যে হবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

 

কোরবানির ঈদে জিনিসপত্রের দাম বাড়া নিয়ে মানুষ যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে ঢের বেশি চিন্তিত ঈদের পর কী হবে তা নিয়ে। পরিষ্কার করে বলা যায়, আগামী ২৪ অক্টোবরের পর কী হবে, কিংবা আবার কতটা হরতাল-অবরোধ-ভাঙচুর-মারামারির মুখোমুখি দেশবাসীকে হতে হবে, তা নিয়ে মানুষ অনেক চিন্তিত, অনেক বেশি আতঙ্কিত। এ আতঙ্ক অমূলক নয়। গত ঈদুল ফিতরের পর দেশবাসীকে হরতালের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, দেখতে হয়েছিল ভাঙচুর-মারামারি। কারণ, নির্বাচনকালীন সরকার-পদ্ধতি নিয়ে দু’দলের অনড় অবস্থানে দেশবাসীর মধ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, ২৪ অক্টোবরের পর কী হবে? দেশের বেশির ভাগ সাধারণ নাগরিক, যারা রাষ্ট্রের কোনো উঁচু বা গুরুদায়িত্বপূর্ণ পদে নেই, তাদের আশঙ্কা প্রতিনিয়ত দেশ রাজনৈতিক সংকটের গভীর থেকে গভীরতর স্তরে নিমজ্জিত হচ্ছে। এ সংকট যতটা না রাজনীতিবিদদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকে। আর এ সংকটের মূলে আছে দু’দলের অনড় অবস্থান, যে অবস্থানে চিড়েচ্যাপ্টা হচ্ছে এবং  হবে দেশের মানুষ।

 

গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র শুধু অসম্ভব নয়, অকল্পনীয়ও বটে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পাকাপোক্ত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না নিয়মিত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত হয়। গ্রিক ভাষা থেকে উদ্ভূত ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনগণের শাসন। গণতন্ত্রে জাতির বা জনগণের নেতা কিংবা শাসকদল নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের মতো কচ্ছপগতিতে হাঁটা গণতন্ত্রের দেশে এর গুরুত্বের চেয়ে প্রভাব প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর বেড়ে যায়। এ দেশে ১৮৭১ সালে প্রথম স্থানীয় নির্বাচন হয়েছিল। সাতচল্লিশে দেশবিভাগের পর প্রথম সাধারণ জাতীয় নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে, যেখানে বাঙালিরা তাদের স্বাধিকারের জন্য একযোগে ভোট দিয়েছিল। মুক্ত বাংলাদেশে নয়টি সংসদ, দুটি গণভোট আর তিনটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ এ পর্যন্ত মোট ১৪টি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের জন্য সামনে আরও একটি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, প্রতিবারই যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসে, তখনই আমাদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে যায়, বেড়ে যায় আশঙ্কা। ৯৬-এর পর থেকে প্রধান দুই দল কিংবা দুই জোট সে আশঙ্কা বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওয়ান ইলেভেনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় ঘর পোড়া গরুর মতো এখন এ দেশের মানুষ সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। যতই মেঘের আড়ালে সূর্য হাসুক বলে টেলিভিশনের টক শো কিংবা রাজনৈতিক সভা-সেমিনারে বক্তারা চেঁচিয়ে বেড়ান না কেন, মানুষের মনে সে ভয় কাটছে না। কারণ দু’দলের জেদ যে পেঁয়াজের ঝাঁজের চেয়ে অনেক তীব্র।

 

গত ১৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে তিনি সংবিধান থেকে ‘এক চুলও’ নড়বেন না। এরপর ২ সেপ্টেম্বর সংসদ ভেঙে না দেওয়া, বর্তমান মন্ত্রিসভা বহাল রাখা এবং ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। চলতি সংসদের শেষ অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে মাননীয় স্পিকার নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। অর্থাৎ জনমনে নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কা, সে সম্পর্কে সরকারের ভাষ্য হলো অবশ্যই নির্বাচন হবে, কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী হবে। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থা ফিরিয়ে না আনলে তারা নির্বাচনে যাবে না এবং নির্বাচন প্রতিহত করবে। প্রধান বিরোধী দল অবশ্য এখন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে স্থির নেই। তাদের দাবি হলো বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করে ও সংসদকে ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার-ব্যবস্থা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছার জন্য দেশের সুধীজনের পাশাপাশি গত দুই মাসে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রসচিব জন কেরি, ঢাকা সফরকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল, ঢাকাস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত লি জুনসহ অনেকেই দু’দলকে সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু দু’দল, আরও স্পষ্ট করে বললে দুই নেত্রী নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণ, আসুন-বসুন, যদি উহা না করেন তবে ইহা সম্ভব নয় ধরনের আল্টিমেটামের মাধ্যমে দিন পার করেছেন, কার্যত কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং দুই দলের নেতারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলায়, হুমকি-ধামকি দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে, হচ্ছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার সংলাপে আন্তরিক নয়; আর সরকারি দলের অভিযোগ, বিরোধী দল সংসদে এসে সংলাপের প্রস্তাব আনছে না।

 

ইতিমধ্যে একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে খবর বেরিয়েছে, বিএনপি ঈদের পর এক সপ্তাহের ‘কড়া আন্দোলন’ নিয়ে মাঠে নামছে। আরেকটি বাংলা দৈনিকের খবর হলো, সরকার নির্বাচন করার জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে ঈদের পর সংঘাত অনিবার্য হিসেবেই দেখা দিচ্ছে। আর সে সংঘাতের মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনের দিকে ধাবিত হবে। যেমনটা বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি করেছিল। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাহীন নির্বাচনের পরিণতি কী হয় সেটার অতীত অভিজ্ঞতা থাকলেও বর্তমান সরকারি দল সে বিষয়ে খুব একটা ভাবছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না। এই দ্বিমুখী জেদে জনগণের চোখের জল বাড়বে এটা সত্যি, কিন্তু তার চেয়ে ভয়ংকর ও আতঙ্কের দিক হলো, ওয়ান ইলেভেনের মতো অনির্বাচিতদের ক্ষমতা দখলের দিকে পা বাড়ানোর আশঙ্কা।

 

একটা কথা মনে রাখতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার-ব্যবস্থা নিয়ে এই দ্বন্দ্ব আদর্শিক দিক থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক কোনো সংকট নয়; কিংবা নয় কোনো সাংবিধানিক সংকটও। বরং দু’দলের জেদের কারণে সৃষ্ট একটি সাময়িক রাজনৈতিক সংকট। দলীয় প্রধানদের অনমনীয়তার কারণে সৃষ্ট এমন সংকটে আমরা ৯৬ সালেও পড়েছিলাম। নমনীয় না হলে দল ও দেশ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে উদাহরণও আমাদের কাছে আছে। সে জন্য কালক্ষেপণ না করে রাজনীতিবিদদের সৃষ্ট সমস্যা রাজনীতিবিদদেরই সমাধান করতে হবে। গণতন্ত্রের পথে ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথের কাঁটাগুলো অপসারণের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতাদের; যার জন্য দরকার তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা।

 

এটা সত্যি যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দিয়ে নির্বাচন হবে নাকি ক্ষমতাসীন দল ও সংসদ বজায় রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা নিয়ে এ দেশের মানুষ যত না চিন্তা করে তার চেয়ে অনেক বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে দু’দলের মুখোমুখি অবস্থানে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ, এ দেশের বেশির ভাগ নিরীহ ও সাধারণ মানুষ কোনো পক্ষে যেতে চায় না, তারা চায় শান্তি। তাই সংবিধান, দল ও নেতার চেয়ে বড় বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মানুষের শান্তি। অব্যাহত সংসদ বর্জন, হরতাল-অবরোধসহ নানা কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতির আশঙ্কায় ভাবিত দেশের মানুষ। দেশের মানুষের এ আশঙ্কা ও আতঙ্ক দূর করার দায়িত্ব দু’দলের নেতাদের। কারণ তারা এ দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেন, দেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। যেহেতু রাজনৈতিক নেতাদের হাত দিয়ে বর্তমান সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাই এর সমাধান তাদেরই করতে হবে। আর রাজনৈতিক বিভেদ মোচনের সহজ ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় বিবদমান পক্ষের মধ্যে আলোচনা। এই আলোচনায় যুক্তিই হতে হবে শেষ কথা। অন্য কোনো শক্তি বা জোর নয়, শুভবুদ্ধি আর উদারতার পরিচয় দিতে হবে। যে দল যত বেশি গণতান্ত্রিক মানসিকতা আর মহত্বের পরিচয় দেবে, সে তত বেশি ফল পাবে আগামী নির্বাচনে।

 

লেখক, সহাকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ