বাবা-মা খুনের ঘটনায় মেয়ের সম্পৃক্ততা | সময় বিচিত্রা
বাবা-মা খুনের ঘটনায় মেয়ের সম্পৃক্ততা
আনন্দ চৌধুরী
19_1

১৪ আগস্ট গভীর রাতে রাজধানীর চামেলীবাগের নিজ বাসায় খুন হন গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ শাখার ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। মাদকাশক্ত মেয়ের উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে বাঁধা দেয়ার কারনেই পুলিশ দম্পতি মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমানকে খুন করা হয়। চা-কফির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে বন্ধুবান্ধব নিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে বাবা-মাকে হত্যা করে ঐশী। তার জবানবন্দিতেই বেরিয়ে এসেছে এমন লোমহর্ষক অনেক তথ্য। মাহফুজ-স্বপ্নার হত্যাকান্ডের এক দিন পর থেকে ঐশী পলাতক ছিল। তবে ঘটনার পর এক দিন ছোট ভাইকে নিয়ে বাসায়ই অবস্থান করেছিল ঐশী। আত্মগোপনের এক দিন পর গত ১৭ আগস্ট পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে সে। ওই দিন রাতে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে ঐশী। হত্যার নেপথ্যে পিতা-মাতার সঙ্গে মেয়ের বিরোধের কথা জানায় গোয়েন্দা সংস্থা। ঐশীর প্রেমের সম্পর্ক, ইয়াবা সেবন ও উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল বাবা-মায়ের সঙ্গে। এ বিরোধ থেকেই সে বাবা-মাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। হত্যাকান্ডে সংগঠিত করতে সে সাহায্য নেয় বন্ধুবান্ধবের। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঐশী, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রনি, বান্ধবী তৃষা ও বাসার কাজের মেয়ে সুমিকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে ৩ জনকে। গ্রেফতারকৃত ঐশী, কাজের মেয়ে সুমি ও বন্ধু রনিকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

এদিকে ঘটনার দুই দিন পর ১৭ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর পল্টন থানায় আত্মসমর্পণ করে নিহত পুলিশ দম্পতির কন্যা ঐশী রহমান। ঐশীকে সঙ্গে সঙ্গেই গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে পল্টন থানা পুলিশ। পরে গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম তাকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এরা হচ্ছে ঐশীর বন্ধু রনি, বান্ধবী তৃষা ও পুলিশ দম্পতির বাসার কাজের মেয়ে সুমি। ঢাকা মহানগর পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পুলিশ দম্পতি হত্যাকান্ডে ঐশীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। হত্যাকান্ডের সময় নিহত দম্পতি ছাড়া ওই বাসায় ঐশী, তার ছোট ভাই ঐহী ও কাজের মেয়ে সুমি ছিল। ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আটককৃতদের বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকান্ডের মোটিভ জানতে পারলেও তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না। হত্যাকান্ডের পরপরই থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। নিহত দম্পতির ছোট ছেলে ঐহী রহমানকে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। এই তিনজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে হত্যাকান্ডে ঐশীর সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ঐশীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার নাম রনি ওরফে জনি। গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক (রাজনৈতিক) মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের একমাত্র মেয়ে ঐশী (১৭) ছিল বেপরোয়া প্রকৃতির। বখাটে ছেলেদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ও ইয়াবা সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামে ‘ও লেভেল’ পড়–য়া ঐশীর আচরণে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব ছিল বলে আত্মীয়স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন ছেলেদের নিয়ে সে বাসায় আসত। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় তার আচরণ ছিল খিটখিটে। এসব বিষয় নিয়ে মায়ের সঙ্গে প্রায়ই তার ঝগড়া বাধত। পিতা পুলিশে চাকরি করার কারণে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতেন। মেয়ের এমন আচরণের তথ্য পাওয়ার পর তিনি মেয়ের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে পিতা-মাতার সঙ্গে ঐশী ও তার কথিত বন্ধুদের দূরত্ব তৈরি হয়। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ঐশী।

১৪ আগস্ট গভীর রাতে রাজধানীর চামেলীবাগের নিজ বাসায় ঐশী তার পিতা-মাতাকে অন্যদের সহায়তায় কুপিয়ে হত্যা করে। ময়নাতদন্তসূত্রে জানা যায়, মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র, ছুরি ও বঁটি দিয়ে কোপানো হয়েছে। গলা, বুক, পাঁজরসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে তাদের হত্যা করা হয়। পরে দুজনের লাশ কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে টেনেহিঁচড়ে ঐশীর বাথরুমে ফেলে রাখা হয়। মাহফুজের শরীরে দুটি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্বপ্নার শরীরে ছিল ১১টি আঘাতের চিহ্ন। এ থেকে পুলিশ ধারণা করছে, পিতার তুলনায় মাতার প্রতি ঐশীর বেশি ক্ষোভ থাকতে পারে। বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড শাহীন জানান, ঘটনার এক দিন পর সকাল আটটার দিকে ঐশী তার ছোট ভাই ঐহী (৯) ও বাসার কাজের মেয়েকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ওই বাড়ির ম্যানেজার আমজাদ হোসেন পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া তাদের বাইরে যেতে বাধা দেন। একই সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী স্বপ্না রহমানের মোবাইল ফোনে কল করেন তিনি। তখন ওই মোবাইল ফোন থেকে বলা হয়,‘আমি রাজশাহী আছি। ওদের যেতে দাও।’ তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মায়ের মোবাইল ফোন তখন ঐশীর কাছেই ছিল। মায়ের ফোন বাজতে থাকলে সে কৌশলে গেট থেকে সরে গিয়ে আমজাদের কল রিসিভ করে। মায়ের কণ্ঠ নকল করে মেয়েদের বাইরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ম্যানেজার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গত ৪ আগস্ট বাড়ি ভাড়া নেওয়ার জন্য ঐশীদের বাসায় যাই। তখন পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেছিলেন, আমার মেয়ে নিয়ে সমস্যায় আছি। যখন-তখন ওকে বাইরে বের হতে দিয়ো না। তার পরও যেতে চাইলে ওর মাকে ফোন করে নিশ্চিত হয়ে নিয়ো।’

 

ঘটনার পর থেকে খুনের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য যাদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে তারা হচ্ছে, ঐশীর বান্ধবী তৃষা, সিএনজিচালক, নিহত দম্পতির ছোট ছেলে ঐহী, খালু রবিউল আলম, সিকিউরিটি গার্ড শাহীন, মোতালেব ও আমজাদ।

ঐহীকে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পিতা-মাতার খুনের রাতে সে কোথায় ছিল, কী দেখেছে? তার বড় বোন তাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল? পিতা-মাতার সঙ্গে তাদের কেমন সম্পর্ক ছিল? এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া খুন হওয়ার রাত তিনটার দিকে স্বপ্না রহমানের মোবাইল ফোন থেকে ঐশীর খালুর নম্বরে কে ফোন করেছিল, সে বিষয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা বলেছিলেন, পিতা-মাতা হত্যাকান্ডের পর ঐশী মায়ের মোবাইল ফোন দিয়ে তার খালুর সঙ্গে কথা বলেছিল। পিতা-মাতার সঙ্গে ঝগড়া হওয়ার কথা খালুকে জানিয়েছিল। মোবাইল ফোন প্রযুক্তির সহায়তায় ওই ফোনের অবস্থান ছিল তখন গেন্ডারিয়া এলাকায়। পরে তারা পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার একটি বাসায় ছিল। গোয়েন্দারা জানান, খুনের পরদিন ঐশী ছোট ভাই ও কাজের মেয়ে নিয়ে একটি সিএনজি ভাড়া করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছে। বিভিন্নজনের কাছে ফোন করেছে আশ্রয় পাওয়ার জন্য। কাউকে ফোনে না পেয়ে সিএনজিচালকের সঙ্গে তার মুগদার বাসায় গিয়েছে। ওই চালককে বলেছে, তার পরিচিত বন্ধুকে সে খুঁজে পাচ্ছে না। তাই কাজের মেয়েকে এক দিনের জন্য তার কাছে রাখতে অনুরোধ করে। এতে সিএনজিচালক রাজি হয়ে ওই কাজের মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দেয়। পরে ঐশী সেখান থেকে কাকরাইল গিয়ে তার ছোট ভাইকে আরেকটি সিএনজি ভাড়া করে চামেলীবাগের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। ঐশী চলে যায় তার বান্ধবী তৃষার বাসায়। তাকে আটকের পাশাপাশি তার কাছ থেকে দুটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগ থেকে বাসার বেশ কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঐশীর কথা অসংলগ্ন। মাঝেমধ্যে সে উল্টাপাল্টা বলছে। ফলে তার সব কথা বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। কীভাবে বাবা-মাকে হত্যা করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঐশী বলেছে, রাত সোয়া ১১টার দিকে তার বাবা অফিস থেকে ফেরার পর সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে। এরপর বাবা কফি খেতে চাইলে সে নিজেই বানানোর কথা বলে। আগে থেকে কিনে আনা চেতনানাশক ওষুধ কফির সঙ্গে মিশিয়ে বাবা-মাকে খেতে দেয়। কফি খাওয়ার পরই তারা দুজন বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। তখন গৃহকর্মী ও ছোট ভাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এরপর সে বাসায় থাকা বঁটি ও চাকু দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে বাবা-মাকে হত্যা করে। তদন্তকারী ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বাবা-মাকে হত্যার আগে সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা খেয়েছে বলে স্বীকার করে ঐশী। ওই আড্ডায় রনিও ছিল। ইয়াবা খাওয়ার কারণে লাশ সরাতে তার কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ঐশীর এই বক্তব্য বিশ্বাস হচ্ছে না গোয়েন্দাদের। সে কি কারও সাজানো বক্তব্য দিচ্ছে না নিজেই বলছে, তা এখনই পরিষ্কার হওয়া যায়নি। তবে বখাটে রনির সঙ্গেই ঐশীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাদকাশক্ত বখাটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি ঐশীর বাবা-মা। তাই মাঝেমধ্যেই ঐশীকে মারধর করতেন তার মা স্বপ্না রহমান। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মাহফুজ ছিলেন সবার বড়। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানার মরাগাঙকান্দা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় পুলিশ দম্পতির লাশ।

 


আপনাদের মতামত দিন:


সকল খবর
চলমান প্রচ্ছদ